Shopnobilap
Rohosshomoy Golpo

রহস্যময় বটগাছ

ছেলে হিসেবে খারাপ ছিল না আদিব। নম্র-ভদ্র,সহজ-সরল ও বেশ শান্ত প্রকৃতির ছেলে ছিল, পড়ালেখায় ও অনেক ভালো। গ্রামের লোকজন থেকে শুরু করে আত্মীয় স্বজন ও স্কুলের শিক্ষক, সবারই প্রিয় ছিল আদিব।

হঠাৎ করেই পাল্টে যায় আদিবের জীবনপন-চলাফেরা। আদিবের জীবনে ঘটে এক রহস্যময় ঘটনা…যার কারণে গ্রামের বসবাসরত লোকজন,আত্মীয়-স্বজন,বন্ধু-বান্ধবী সবাই তাকে দেখে ভয় পেত। এমনকি বাড়ীর সবাই তার সব কথা মেনে চলত। বাড়ীর কর্তা না হয়েও যেন সে বাড়ীর কর্তৃত্ব পালন করতো। সে মুখ দিয়ে একবার যা বলতো সাথে সাথে তা হয়ে যেত….কেউ কোন কিছুতে না করলে সেইটা ও যেন নিজে নিজে হয়ে যেত। আদিবকে নিয়ে পরিবারের সবার যেন চিন্তার শেষ ছিল না।

ছোট্ট একটি গ্রাম, নাম ইছামতি। এই গ্রামে হাতে গোনা কয়েকটি ঘর নিয়ে মানুষের বসবাস। কোলাহল মুক্ত নির্জন,নিরিবিলি পরিবেশ। আশেপাশে তেমন কোন গ্রাম নেই বললেই চলে….সামনে যত দূর চোখ যায় শুধু সবুজের সমারোহ আর গাছ-গাছালিতে ঘেরা বন-জঙ্গল ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে একটি নদী। নদীর ঠিক পূর্ব পাশেই প্রাইমারি স্কুল….প্রাইমারি স্কুলের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে সরু চিকন রাস্তা আর এই রাস্তার পাশেই রয়েছে একটি বটগাছ। এই বটগাছ কে ঘিরেই আদিবের জীবনে ঘটে গেছে এক রহস্যময় ঘটনা।

দু-চার গ্রামের লোকের কাছে এটি একটি ঐতিহ্যবাহী গাছ হিসেবে পরিচিত। এই বটগাছ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত। এই গাছ সম্পর্কে একেক জনের একেক রকম কৌতুহল। গ্রামের ছেলেমেয়ে গুলা বিকেল হলেই এখানে খেলাধুলা করতে ছুটে চলে আসে। আর এ পথ ধরেই বাচ্চারা স্কুলে যাওয়া-আসা করে। আদিব তখন ক্লাস ফাইভে পড়ে,আর কিছু দিন পর ফাইনাল পরীক্ষা। আদিব ও তার বন্ধুদের সাথে প্রতিদিন বটগাছের নিচে আসে,সবাই মিলে হৈ হুল্লোড় করে আনন্দে মেতে উঠে,খেলাধুলা করে। এভাবেই ইছামতি বাসিন্দাদের দিন কেটে যায়।

বেশ কিছুদিন পর একদিন বিকেলে সবাই মিলে বটগাছ তলায় খেলছে হঠাৎ করেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়। যে যার মত দৌড়ে গাছের নিচে গিয়ে আশ্রয় নেয়। কিছুক্ষন পর বৃষ্টি শেষ হয়ে গেলে আবার সবাই খেলা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরে। কিন্তু আদিব আর খেলতে আসে না গাছের নিচেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে কি যেন বলতে থাকে। বন্ধুরা কাছে গিয়ে কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলে না,আপন মনে নিজে নিজে কথা বলতেই থাকে। আদিবের এমন অবস্থা দেখে সবাই অনেক ভয় পেয়ে যায় এবং বাসায় এসে খবর দেয়। সাথে সাথে আদিবের বাবা গিয়ে আদিবকে বাড়িতে নিয়ে আসে। আদিব তখন ও বিড়বিড় করে কি যেন বলেই চলেছে ,কারো কথার কোন উত্তরও দিচ্ছে না…

এমতবস্থায় কথা বলতে বলতেই হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যায়। কি হয়েছে ,কেন এমন করছে কেউ ই বুঝে উঠতে পারছে না… গ্রামের অনেকেই ছুটে এসেছে আদিবকে দেখতে। এরই মধ্যে ডাক্তার ডাকা হয়েছে ,আদিবকে পরীক্ষা করে তেমন কিছুই বলতে পারল না,সবকিছু নরমাল আছে এই বলে ডাক্তার ও চলে গেলো। একটু পর জ্ঞান ফিরে আসলে আবার আগের মত বিড়বিড় করতে শুরু করলো। জিনের আঁচড় পড়েছে ভেবে কবিরাজ নিয়ে এসে দেখাল তবুও কোন কাজ হল না। কবিরাজ অনেক চেষ্টা করেও আদিবকে ঠিক করতে পারলেন না। তিনিও ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলেন।

গ্রামের অনেকেই সেই গাছের নিচে যায় দাঁড়িয়ে থাকে তারপরও কারো কিছু হয় না,কেউ ই সঠিক ভাবে বলতে পারে না এর আসল রহস্য কি ? মাঝে মাঝেই আদিব ওই গাছের নিচে যায়, রহস্যময় বট গাছের দিকে তাকিয়ে কথা বলে, কি বলে অন্য কেউ তা বুঝতে পারে না। আদিবকে দেখে আত্মীয় স্বজন এমনকি গ্রামের ছোট বড় সবাই এখন ভয় পায়। স্কুলের বন্ধুরা ও দূরে দূরে থাকে, কেউ তার সাথে বসে না ,মিশে না,এমনকি কথাও বলে না।

অনেক চেষ্টা করেও এই রহস্য উধঘাটন করা সম্ভব হয় নি। বৈদ্য ,কবিরাজ ,ডাক্তার দেখিয়ে ও সুস্থ করা করা গেলো না। পরিবারের সবাই খুব চিন্তিত আদিবকে নিয়ে। দেখতে দেখতে এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেলো। আদিব এখনো তেমনটাই আছে, এই ভাল তো এই খারাপ কখন কি বলছে সে নিজেও জানে না….বাড়িতে সে যা বলে তাই সবাই মেনে চলে , কেউ কোন কাজে না, করলে ও সেইটা ও আপনাআপনি হয়ে যায়। আস্তে আস্তে আদিব বড় হচ্ছে আর ওর বাবা মার চিন্তা যেন বেড়েই চলেছে। ভবিষ্যতে ছেলের কি হবে ,কবেই বা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে এসব নিয়ে তারা হতাশ।

এভাবে আদিব স্কুল কলেজ পেরিয়ে এখন অনার্স কলেজে পড়ালেখা করে। দেখতে দেখতে অনেকগুলা বছর কেটে গেছে তবুও সে পুরোপুরি সুস্থ না। বড় হলেও আগের মতোই আছে…কলেজে ও আদিব এর কোন বন্ধুবান্ধবী তার সাথে কথা বলেন, মিশে না এমনকি কেউ তার পাশ ঘিরে ও কখনো দাঁড়ায়নি । সারাক্ষণ সে একা একা বসে থাকে আর একা একা ই কথা বলে যায়। অবস্থার কোন উন্নতি না দেখে শেষ পর্যন্ত সাইক্রিয়াটিস্ট এর কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। তিনি আদিবকে ডেকে সেদিন ঠিক কি হয়েছিল বলতে বললেন। আদিব আপন মনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেদিনের পুরো ঘটনার বর্ণনা দিলেন। তিনি শুনে তেমন কিছুই বলতে পারলেন না। বরং তিনি নিজেও বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন এই রহস্যময় ঘটনাটি শুনে। প্রায় সব ধরণের চিকিৎসা শেষ কিন্তু আদিবের সমস্যার সঠিক কোন সমাধান এখনো কেউ দিতে পারে নাই। সে এখনো অসুস্থ এই রহস্যময় ঘটনার জন্য ।

অহনা নামের একটা মেয়ে, আদিব এর কলেজে পরে । মেয়েটা বেশ ভাল ,নম্র ভদ্র এবং বন্ধুসুলভ। খুব সহজেই সবাইকে আপন করে নিতে পারে। অহনা আদিবের ক্লাসমেট, একই ডিপার্টমেন্টে পড়ে। কলেজের প্রথম দিন থেকেই সে আদিবকে লক্ষ্য করেছে। আদিবের চলাফেরা ,ওর অসুস্থতা ,ওর একাকীত্ব সব কিছু অনুসরণ করে… প্রায়ই দেখে আদিব একা একা বসে থাকে, আপন মনে কি কি যেন বলে অথচ আশেপাশে কেউ নাই। একদিন অহনা আদিবের কাছে যায় ওর সাথে কথা বলে, বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়। ওকে কথা বলার জন্য বিভিন্ন ভাবে উৎসাহিত করে। আদিব ও বেশ আগ্রহ নিয়ে কথা বলে ,একসাথে ঘুরতে যায়, পড়াশোনা ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে।

এক পর্যায়ে ওরা খুব ভাল বন্ধু হয়ে যায়….অহনা সবসময় আদিবের খেয়াল রাখে ,ওর দুর্বলতা কাটাতে চেষ্টা করে ,অনেক কেয়ার নেয় আদিব যেন বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি কিছু। আদিব মাঝে মাঝেই আগের মতো বিড়বিড় করে কথা বলে আর সেই সময় অহনা আদিবের গায়ে হাত ছোঁয়ালেই আদিব একদম সুস্থ হয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে থাকে। কিন্তু আবার কিছুদিন না যেতেই আবার ও একই সমস্যা দেখা দেয়।আস্তে আস্তে অহনা আদিবের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। আদিবকে সুস্থ করে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। এভাবে আরও বছর খানেক চলে যায়।

হঠাৎ শোনা যায় রাজপরিবারের ছেলে সেই ঐতিহ্যবাহী বটগাছ কেটে ওখানে একটা ফ্যাক্টরী তৈরী করবে। গ্রামের সবাই বিষয়টি জানতে পেরে অনেক ভয় পেয়ে যায়। রাজ সন্তান কে সবকিছু খুলে বললেও তিনি কথাটা কানে তুলেন নি বরং তিনি তার সিধান্তই অটুট । কিছুদিন পরেই শুরু হবে ফ্যাক্টরীর কাজ। তাই বটগাছ কাটার সমস্ত প্রস্তুতিও শেষ। পরের দিন সকালে শুরু হবে গাছ কাটার কাজ । শুনতে পেয়ে গ্রামের সব লোক সে খানে উপস্থিত হয়, শুধু রাহুল তার পরিবার এবং অহনা বাদে ।

যখন বটগাছ কাটার জন্য একটা করে কোপ দেওয়া হয় ঠিক তখনি আদিবের শরীরে একটা করে আঘাত লাগতে থাকে, যতবার কোপ দেয় ততবার ই আঘাত লাগে… আঘাতে পর আঘাতে শরীর থেকে অনেক রক্ত ক্ষরণ হয় এবং মুমূর্ষু অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে সে মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যায়।এ মন সময় অহনা এসে আদিবের পাশে বসে গায়ে হাত বুলাতে থাকে আর আদিব যেন একটু একটু করে প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করে । এভাবে বেশ কিছুক্ষণ আদিবকে নিয়ে দৌঁড়ঝাপ করতে হয়…. অহনার হাতের ছোঁয়ায় আদিব মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরে আসে ঠিকই কিন্তু ওপর পশে গাছ কাটার শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে রাজ সন্তান মারা যায়।

ওপর পাশে আদিব গান জ্ঞান ফিরে পায় আর আবোল তাবোল কথা বলতে শুরু করে সে কে,কোথা থেকে এসেছে , এত মানুষ তাকে কেন দেখতে আসছে, তার কি হয়েছে এমন নানান প্রশ্ন করেই চলেছে। অবশেষে অহনা বাধ্য হয়ে আদিব কে সব কথা খুলে বলে, তার কি হয়েছিলো , তার সাথে কি, কি ঘটেছে সব কিছু । আর এই সব কিছু শুনে আদিব আবার অজ্ঞান হয়ে যায় । পুনরায় যখন জ্ঞান ফিরে পায়, আদিব তখন বিয়ের পিঁড়িতে বসে আছে আর ওপর পশে বধূ সেজে বসে আছে অহনা । সব কিছু মিলিয়ে আদিব এর জীবনে ঘটে যায় আর ও একটা রহস্যময় ঘটনা। যা কখনো ভুলবার নয় ।

রহস্যময় গল্প ও ভুতের গল্প পড়তে ঘুরে আসুন Bangla Vuter Golpo.

তাসনিয়া তাবাসসুম

Show Buttons
Hide Buttons
error: Don\'t Try To Copy Please !!